নিজস্ব প্রতিবেদক
২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা, আধুনিক রোগ নির্ণয়, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড, পরিচ্ছন্ন হাসপাতাল প্রাঙ্গণ—নানা উদ্যোগে বদলে যাচ্ছে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্র। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জান্নাতুন নাঈমের নেতৃত্বে সেবার মানোন্নয়ন ও মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে সরকারি চিকিৎসাসেবায় নতুন সম্ভাবনা জাগায় স্বস্তি ফিরছে স্থানীয় মানুষের মনে, বাড়ছে হাসপাতালটির প্রতি আস্থা।
ফলে বৃহত্তর রায়পুরা উপজেলার সাধারণ মানুষের সরকারি চিকিৎসাসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার মানোন্নয়নের পাশাপাশি রোগীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা জোরদার হয়েছে।
বৃহৎ আয়তনের এই উপজেলার সাধারণ মানুষের সরকারি চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান ভরসা রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বর্তমানে বহির্বিভাগে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা এবং জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টা সেবা চালু রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ ও প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য রোগীদের জেলা সদর কিংবা রাজধানী ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রোগ নির্ণয় সহজ ও দ্রুত করতে সম্প্রতি হাসপাতালে সংযোজন করা হয়েছে আধুনিক সেল কাউন্টার মেশিন। এর মাধ্যমে রোগীদের প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা আগের তুলনায় দ্রুত ও সহজে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। নতুন এই যন্ত্রের ব্যবহারে রোগ নির্ণয়ের সময় কমার পাশাপাশি রোগীদের ভোগান্তি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় কমাতে সহায়তা মিলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিশেষ করে ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকা হওয়ায় রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য চালু করা হয়েছে ১০ শয্যার পৃথক বিশেষ ওয়ার্ড। সেল কাউন্টার মেশিনের মাধ্যমে রক্ত পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
এ ছাড়া হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে এক্স-রে ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা সরকারি নির্ধারিত সাশ্রয়ী মূল্যে সম্পন্ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারিভাবে সরবরাহ করা ওষুধ রোগীদের মধ্যে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিতরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের রোগীরা উপকৃত হচ্ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতালের পরিবেশ উন্নয়নেও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও তদারকির ফলে হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরের পরিবেশ আগের তুলনায় পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসাসেবায় সীমাবদ্ধ না থেকে রায়পুরার প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতেও কার্যক্রম জোরদার করেছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই), হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন, ওপেন এসআরপির মাধ্যমে ডিজিটাল স্বাস্থ্যতথ্য সংরক্ষণ, ভারবাল অটোপসি এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর সেবামূলক কার্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এসব কর্মসূচি নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে সমন্বয় ও তদারকি বাড়ানো গেলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ আরও সহজে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাবেন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রায়পুরার বাসিন্দা মাজেদা বেগম বলেন, “আগে হাসপাতালে এসে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হতো। পরিবেশও খুব একটা ভালো ছিল না। তবে এখন চিকিৎসকেরা মনোযোগ দিয়ে রোগীদের কথা শোনেন। পরিবেশও আগের চেয়ে পরিচ্ছন্ন মনে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা নেওয়া অনেক সহজ হয়েছে।”
জরুরি বিভাগে সেবা নিতে আসা আরেক রোগীর স্বজন বলেন, “জরুরি প্রয়োজনে এখন আগের তুলনায় দ্রুত চিকিৎসক ও নার্সদের সেবা পাওয়া যাচ্ছে। চিকিৎসকদের আন্তরিকতা রোগীর স্বজন হিসেবে আমাদের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমিয়ে দেয়।”
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্বিক পরিবর্তন, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের তদারকি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জান্নাতুন নাঈম বলেন, “দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের মানুষের কাছে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি, ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং সরকারি ওষুধের স্বচ্ছ বণ্টন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইপিআই, হাম ক্যাম্পেইন, কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবা, ওপেন এসআরপি ও ভারবাল অটোপসির মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “সেল কাউন্টার মেশিনের মতো আধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত হওয়ায় রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়ছে। চিকিৎসক, নার্স, মাঠকর্মী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সেবার মান উন্নয়নের চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও আরও আধুনিক যন্ত্রপাতি পাওয়া গেলে রায়পুরাবাসীকে আরও উন্নত ও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে নেওয়া উদ্যোগগুলো ইতিবাচক। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলোও দূর করতে হবে। বিশেষ করে ভর্তি রোগীদের জন্য শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন, জনবলসংকট নিরসন এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের সরবরাহ বাড়ানো জরুরি।
তাঁদের মতে, এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে নরসিংদী জেলার একটি আদর্শ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব হবে।