নরসিংদী প্রতিনিধি
নরসিংদীর রায়পুরার ঐতিহ্যবাহী সরকারি আদিয়াবাদ ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মোহা. নূর সাখাওয়াত হোসেন মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ পুনর্তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাঁর বহিষ্কারাদেশ পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষকরা।
এ বিষয়ে গত ৪ জুন শিক্ষামন্ত্রী এবং ২৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালকের কাছে পৃথক লিখিত আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে পূর্বে পরিচালিত তদন্ত প্রতিবেদন পুনর্বিবেচনা করে অভিযোগগুলো উচ্চতর পর্যায়ে পুনর্তদন্ত এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী স্থায়ী বহিষ্কারসহ প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
জানা গেছে, ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত সরকারি আদিয়াবাদ ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজটি রায়পুরা উপজেলার একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি এ অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষক মেসবাহুল হক এবং এলাকাবাসী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পক্ষে মো. তৌহিদুল ইসলাম, মো. শিমুল হোসেন, মো. সোহাগ মোল্লা, মো. জহিরুল ইসলাম, মো. আমজাদ হোসেন ও মো. সোহরাব মোল্লাসহ অন্যরা পৃথক আবেদনের মাধ্যমে এসব অভিযোগ পুনর্তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
আবেদনকারীদের অভিযোগ, মোহা. নূর সাখাওয়াত হোসেন মিয়া ২০০৫ সালে শূন্যপদে নিয়োগ পেয়ে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
তাঁদের দাবি, ২০২৪ সালে মাউশি কর্তৃক গঠিত তদন্তকারী দল এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যক্ষকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনকারীরা জানান, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর অধ্যক্ষ আত্মগোপনে চলে গেলে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে মাউশির মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। পরে মাউশির গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিনিধিরা প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
আবেদনকারীদের দাবি, ওই তদন্তেও অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, তদন্ত কার্যক্রমের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে অধ্যক্ষ মোহা. নূর সাখাওয়াত হোসেন মিয়াকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে পরবর্তীতে ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে উচ্চতর কোনো তদন্ত ছাড়াই শুনানির মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁকে বহিষ্কারাদেশ থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বলে অভিযোগ করেছেন আবেদনকারীরা।
এ ঘটনায় এলাকাবাসী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। তাঁদের অভিযোগ, পূর্ববর্তী তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হলেও পরবর্তীতে উচ্চতর তদন্ত ছাড়াই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করায় বিষয়টি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
আবেদনকারীদের আরও দাবি, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হলেও অধ্যক্ষ এখনো প্রতিষ্ঠানে এসে নিয়মিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।
আবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার পর গত ১৯ এপ্রিল অধ্যক্ষ কলেজে এসে তাঁর কক্ষে বসার চেষ্টা করেন। বিষয়টি জানতে পেরে বিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজন কলেজ ক্যাম্পাসে এসে তাঁকে সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। এ সময় তাঁদের সঙ্গে অধ্যক্ষের কথা কাটাকাটি হয় এবং একপর্যায়ে তাঁকে লাঞ্ছিত করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ বকুলের নির্দেশে অধ্যক্ষ কলেজে উপস্থিত না হয়ে রায়পুরায় বসে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে দাবি করেছেন আবেদনকারীরা। তবে এ বিষয়ে সংসদ সদস্যের বক্তব্য জানা যায়নি।
আবেদনকারীদের অভিযোগ, অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন নিয়ে সৃষ্ট এই পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও তাঁরা দাবি করেন।
এ অবস্থায় অধ্যক্ষের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা ও বাতিল করে মাউশির পূর্ববর্তী তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারীরা।
একই সঙ্গে উচ্চতর পর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলো পুনর্তদন্ত, তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী স্থায়ী বহিষ্কারসহ উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে অধ্যক্ষ মোহা. নূর সাখাওয়াত হোসেন মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এদিকে, গত ৪ আগস্ট শিক্ষামন্ত্রী বরাবর দেওয়া আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই দিন শিক্ষা সচিবকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।