নিজস্ব প্রতিবেদক
বাবার ভালোবাসা, ত্যাগ আর সন্তানের প্রতি অকৃত্রিম মমতা—সবই যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে দুর্গাপূজার মণ্ডপে। প্রচলিত মণ্ডপসজ্জার বাইরে গিয়ে ‘বাবার ভালোবাসা’ থিমে দর্শনার্থীদের হৃদয় ছুঁয়েছে নরসিংদীর বাগবিতান ক্লাব। নান্দনিক উপস্থাপনায় বাবার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার চিরন্তন গল্প তুলে ধরে প্রশংসা কুড়াচ্ছে ক্লাবটির এই ব্যতিক্রমী আয়োজন।
শারদীয় দুর্গোৎসব মানেই আনন্দ, সম্প্রীতি ও সৃজনশীলতার বর্ণিল সমাহার। প্রতিবারই দেবী দুর্গার আগমনকে ঘিরে প্রতিমা নির্মাণ ও মণ্ডপসজ্জায় থাকে নতুনত্বের চমক। তবে এবার নরসিংদীর বাগবিতান ক্লাবের মণ্ডপে প্রাধান্য পেয়েছে জীবনের এক চিরন্তন সম্পর্ক—বাবার সঙ্গে সন্তানের ভালোবাসার বন্ধন।
মণ্ডপের শৈল্পিক উপস্থাপনায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে বাবার নিরলস পরিশ্রম, নিজের কষ্ট আড়াল করে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রাম এবং প্রতিকূল সময়ে সন্তানকে আগলে রাখার চিত্র। একজন বাবার নীরব আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধের গল্পই যেন শিল্পের ভাষায় তুলে ধরেছেন আয়োজকেরা। শিল্পীর এই শৈল্পিক কারুকার্য আমাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন আজ থেকে আরো ২০০ বছর আগে দিনগুলোতে।
মণ্ডপ দেখতে এসে দর্শনার্থীদের অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন শৈশবের স্মৃতিতে। কারও মনে পড়ছে বাবার হাত ধরে প্রথম পথচলার দিন, কারও চোখের সামনে ভেসে উঠছে বাবার কাঁধে চড়ে পৃথিবী দেখার আনন্দময় মুহূর্ত। আবার কারও মনে নাড়া দিচ্ছে দূরে থাকা কিংবা হারিয়ে যাওয়া প্রিয় বাবার স্মৃতি। ফলে মণ্ডপসজ্জার নান্দনিকতার পাশাপাশি আবেগঘন এই থিমও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে।
আয়োজনটির বিশেষত্ব শুধু এর দৃষ্টিনন্দন উপস্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্যে রয়েছে গভীর সামাজিক বার্তা। ব্যস্ত জীবনে অনেক সময় বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়। বাগবিতান ক্লাবের এই উদ্যোগ সন্তানদের সেই দায়িত্বের কথা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

বাবার ভালোবাসা সব সময় মুখের কথায় প্রকাশ পায় না। কখনো তা প্রকাশিত হয় ঘাম ঝরানো পরিশ্রমে, কখনো নীরব ত্যাগে, আবার কখনো সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নেওয়া কঠিন সিদ্ধান্তে। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের জীবনকে সুন্দর করে তোলার এই প্রচেষ্টাই বাবার ভালোবাসাকে অনন্য করে তোলে। মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে সেই না-বলা অনুভূতিকেই মানুষের সামনে তুলে ধরেছে বাগবিতান ক্লাব।
ধর্মীয় উৎসবের আবহে পারিবারিক বন্ধন, মানবিকতা ও পারস্পরিক সহমর্মিতার এমন বার্তা দুর্গোৎসবের আনন্দে যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা। দর্শনার্থীদের কাছে তাই এই মণ্ডপ কেবল প্রতিমা দর্শন কিংবা উৎসব উপভোগের জায়গা নয়; বরং নিজের শৈশব, পারিবারিক সম্পর্ক ও বাবার অবদানের কথা স্মরণ করারও একটি উপলক্ষ।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে সন্তানদের মধ্যে বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ আরও জোরালো হবে। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে কোনো বাবাকে যেন অবহেলা ও একাকিত্বের শিকার হতে না হয়, সে বিষয়েও সচেতনতা তৈরি হবে।
দেবী দুর্গার বন্দনার পাশাপাশি বাগবিতান ক্লাবের এই ব্যতিক্রমী আয়োজন যেন একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—সন্তানের জীবনে বাবার ভালোবাসা অন্যতম বড় শক্তি। সেই ভালোবাসার ঋণ পুরোপুরি শোধ করা সম্ভব না হলেও যত্ন, সম্মান, সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীল আচরণের মধ্য দিয়ে বাবার প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটানো সম্ভব।
বাগবিতান ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ সুব্রত কুমার সাহা বলেন, “গত বছর দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার পর থেকেই আমাদের ক্লাবের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মণ্ডপের মূল থিম কী হবে, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করি। অনেক চিন্তাভাবনার পর আমরা ‘বাবার ভালোবাসা’ থিমটি গ্রহণ করি। প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও পরবর্তী সময়ে এর মধ্যে ভিন্নতা খুঁজে পান অনেকে। ধীরে ধীরে সবাই থিমটি গ্রহণ করেন।
তিনি আরও বলেন, “গত এক মাস ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের এই থিম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে মণ্ডপসজ্জার কাজ সম্পন্ন করে যখন এটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, তখন আমরা আমাদের আয়োজনের সার্থকতা অনুভব করছি। একজন বাবা সন্তানের জন্য কতটা অক্লান্ত পরিশ্রম করেন এবং নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে কীভাবে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন, শিল্পী তাঁর শৈল্পিক ছোঁয়ায় সেই চিত্রই অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।”
নরসিংদী পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও সাংবাদিক মাখন দাস বলেন, “উৎসবের আমেজে বাগবিতান ক্লাবের আয়োজন সত্যিই ব্যতিক্রমী ও সার্থক। দর্শনার্থীদের জন্য এটি একটি ভিন্নধর্মী উপস্থাপনা, যা প্রশংসার দাবি রাখে। উৎসবের আবহে তাঁরা যেভাবে পারিবারিক সম্পর্ক ও বন্ধনের দৃশ্য তুলে ধরেছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। শিল্পী তাঁর শৈল্পিক ছোঁয়ায় মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধনের দৃঢ়তা ও সৌন্দর্য অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।”তরুণ প্রজন্মকে পারিবারিক বন্ধনটা আরো দৃঢ় আবদ্ধ করতে তাদের এই আয়োজকে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই।