নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই আন্দোলনের ক্ষত ও স্মৃতি বুকে নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে নরসিংদী সাংবাদিক ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত কার্যালয় ভবন। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার হামলায় ভবনটি ভাঙচুর ও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লুট করা হয় কার্যালয়ের বেশ কিছু দামি ও মূল্যবান সরঞ্জাম। অথচ আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে নরসিংদীতে কর্মরত সাংবাদিকদের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল এই কার্যালয়। আন্দোলনের অসংখ্য দৃশ্য ধারণ ও সংরক্ষণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভবনটির নাম। কিন্তু ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত এই সাংবাদিক সংগঠনটির ভাগ্যে জোটেনি কোনো আর্থিক সহায়তা।
জেলার সাংবাদিকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং তাঁদের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনটি। গুরুত্বপূর্ণ এই কার্যালয় ভাঙচুরের পরপরই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা পরিদর্শন করা হয়। তবে পরিদর্শনের পর ভবনটি সংস্কার কিংবা সংগঠনটিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। সরকারি কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও সংগঠনটি কোনো আর্থিক অনুদান পায়নি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে নরসিংদীতেও সংঘাত, বিক্ষোভ ও নানা ঘটনার ছবি এবং ভিডিও ধারণে ব্যস্ত ছিলেন সাংবাদিকেরা। স্থানীয়দের কাছে আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত স্থানে অবস্থিত নরসিংদী সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যালয়টি আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্দোলনের বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করলে এই ভবন থেকে ধারণ করা দৃশ্যের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
কিন্তু যে আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ নথিবদ্ধ করতে এই কার্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, সেই আন্দোলনের সময়ই ভবনটি ভাঙচুরের শিকার হয়। এতে কার্যালয়ের অবকাঠামোর পাশাপাশি মূল্যবান সরঞ্জামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লুট হওয়া সরঞ্জাম ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের কারণে সংগঠনটির স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের পরিদর্শন ক্ষতিগ্রস্ত সংগঠনটির মধ্যে আশার সঞ্চার করলেও পরবর্তী সময়ে সহায়তার দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় হতাশা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কার্যালয়টির সংস্কার, পুনর্বাসন কিংবা ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থা হয়নি বলে অভিযোগ সংগঠনটির নেতাদের।
সাংবাদিকদের কাজ শুধু সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নথিবদ্ধ করাও তাঁদের দায়িত্বের অংশ। জুলাই আন্দোলনের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের ছবি ও ভিডিও ধারণ এবং সংরক্ষণে যেসব স্থান ও প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রেখেছে, সেগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নরসিংদী সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যালয়ের বর্তমান অবস্থা, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং সংস্কারে প্রয়োজনীয় অর্থের হিসাব নিরূপণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে ঘটনার পর জেলা প্রশাসন কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, ভবনটির সংস্কার বা পুনর্নির্মাণে কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না এবং সংগঠনটি ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তা পাবে কি না, সেসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নরসিংদী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শাহাদাৎ হোসেন রাজু বলেন, “নরসিংদী জেলা প্রশাসন কর্তৃক প্রণীত নিহত ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের তালিকা দেখে আমি রীতিমতো বিস্মিত হয়েছি। সেখানে শুধু সাধারণ মানুষের নামই নয়, অনেক সাংবাদিকের নামও দেখা যায়। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, আহত জুলাই যোদ্ধাদের নাম সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পর্কে নরসিংদীর সাধারণ মানুষকে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। ভুয়া তালিকা প্রণয়ন করে তাঁদের বিভিন্ন ধরনের অনুদান দেওয়া হয়েছে বলে আমার অভিযোগ। অথচ ধ্বংসাবশেষ বুকে নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে পেশাজীবী সংগঠন নরসিংদী সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যালয়। ভবনটি সংস্কারে কোনো আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “সেদিন নরসিংদী জেলা কারাগার ভাঙার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে নরসিংদী সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্যরাই সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। তাঁরা যথারীতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্যও দিয়েছেন। অথচ কার্যালয়ের অভাবে জেলার এই ঐতিহ্যবাহী সাংবাদিক সংগঠনটি আজ অস্তিত্বসংকটে পড়েছে।”
জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি বহনকারী এই ভবন শুধু একটি সাংবাদিক সংগঠনের কার্যালয় নয়; নরসিংদীতে আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ নথিবদ্ধ করার ইতিহাসের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির সংস্কার ও পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সংগঠনটির পাশে দাঁড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিকেরা।
#