নিজস্ব প্রতিবেদক
পুরোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটের সক্ষমতা বাড়িয়ে একই পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার করে অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে হাতে নেওয়া হয়েছিল ‘ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং’ প্রকল্প। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোর এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের কথা ছিল মাত্র আড়াই বছরে। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় এক দশক পার হলেও প্রকল্পটি এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। বারবার মেয়াদ বৃদ্ধি ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পটি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি শুরুতে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় একাধিক দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রথমে দুই বছর, পরে আরও এক বছর এবং দ্বিতীয় সংশোধনের মাধ্যমে অতিরিক্ত দুই বছর সময় বাড়িয়ে মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
কিন্তু এরপরও কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় আরও তিন দফায় মোট ৩ বছর ৭ মাস সময় বৃদ্ধি করা হয়। সর্বশেষ সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। ফলে আড়াই বছরের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগছে প্রায় সাড়ে ৯ বছর, যা মূল মেয়াদের তুলনায় প্রায় ২৯০ শতাংশ বেশি।
মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়ও। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৫১৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। পরবর্তীতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪৩৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রস্তুত করা নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনের খসড়ায় প্রকল্পটির দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত নানা সীমাবদ্ধতার চিত্র উঠে এসেছে।
তবে দীর্ঘ বিলম্বের মধ্যেও প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৭৭ দশমিক ২৯ শতাংশ।
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় গ্যাস টারবাইন ইউনিট ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ শেষ করে ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি তা ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একই সময়ে ওপেন সাইকেল অপারেশন সম্পন্ন করে ইউনিটটিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
পরবর্তী দুই বছর সাত মাসে ইউনিটটি থেকে প্রায় ৯২ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলেও গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ১৫ মাস উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।
এরপর ২০২১ সালের জুলাই মাসে চলমান অবস্থায় গ্যাস টারবাইনের কম্প্রেসরে বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ মেরামতের জন্য সুইজারল্যান্ডভিত্তিক জিই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা দেখা দেয়। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও দীর্ঘায়িত হয়।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৫ সালের জুন মাসে আইনি জটিলতা কাটিয়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়। বর্তমানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ দল মেরামত ও কমিশনিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পটির অডিট সম্পন্ন হয়েছে। এতে মোট ১৩টি আপত্তি উত্থাপিত হয়। এর মধ্যে একটি নিষ্পত্তি হলেও বাকি আপত্তিগুলো এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
আইএমইডি প্রকল্পটির প্রধান দুর্বলতার মধ্যে ঋণের অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, অগ্রিম অর্থ পরিশোধে জটিলতা, একাধিকবার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ঋণচুক্তি সংশোধনের বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা, পুরোনো যন্ত্রপাতির অনির্ভরযোগ্যতা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন কারিগরি চ্যালেঞ্জকে সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারকে ১৫ শতাংশ অগ্রিম অর্থ পরিশোধের কথা থাকলেও ঋণদাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মিগা থেকে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকল্পের শুরু থেকেই বাস্তবায়ন কার্যক্রম ধীরগতির হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া প্রকল্প এলাকা দখলমুক্ত ও হস্তান্তরসংক্রান্ত জটিলতা, কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব, পিজিসিবির ২৩০ কেভি জিআইএস সাবস্টেশন নির্মাণে বিলম্ব, আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা, দেশি-বিদেশি মামলা, সুইজারল্যান্ডে উদ্ভূত পরিস্থিতি, মেরামত-পরবর্তী প্রস্তুতি এবং যান্ত্রিক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বিষয়টির ব্যাপারে সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ বলেন, “কোনো প্রকল্পের মেয়াদ এত বেশি বৃদ্ধি পাওয়া কাম্য নয়। প্রকল্প গ্রহণের আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কারও গাফিলতি বা দায়িত্বহীনতা থাকলে তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিদ্যুৎ খাতে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি সময়মতো বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয় সম্ভব হতো। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং বারবার বাস্তবায়ন পরিকল্পনা পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পটির কার্যকারিতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।