নিজস্ব প্রতিবেদক
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি আদিয়াবাদ ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে দুর্নীতির অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ নূর সাখাওয়াত হোসেন মিয়ার পুনর্বহালকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় এলাকাবাসী, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের তীব্র প্রতিবাদের মুখে প্রতিষ্ঠানটিতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নূর সাখাওয়াত হোসেন মিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের মানসিকভাবে হয়রানির নানা অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানে একক আধিপত্য বজায় রাখেন এবং ভিন্নমত পোষণকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে চাপের মধ্যে রাখতেন।
একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, অশালীন ভাষা ব্যবহার এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল তার নিয়মিত কর্মকাণ্ডের অংশ। এছাড়া ২০০৮ সালে কলেজের দুই শিক্ষক ফরহাদ ও সফিককে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের দাবি, ওই দুই শিক্ষক বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র শিক্ষক নিখিল চন্দ্র সূত্রধর কোচিং বাণিজ্য ও ক্লাস না নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরায় তাকে শিক্ষক প্রতিনিধি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে অপমানজনক ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক রেজুলেশন খাতায় তার বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্যও লিপিবদ্ধ করা হয় বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট প্রতিষ্ঠানের মাঠে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি শিক্ষার্থীদের বাড়িতে চিঠিও পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যক্ষ নূর সাখাওয়াত হোসেন মিয়া আত্মগোপনে চলে যান বলে দাবি আন্দোলনকারীদের। এরপর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, অভিভাবক ও সচেতন মহল তার বিরুদ্ধে আরও সোচ্চার হয়ে ওঠে।
শিক্ষকদের স্টাফ কাউন্সিল সভায়ও তার বিরুদ্ধে সর্বসম্মতিক্রমে অনাস্থা প্রস্তাব গৃহীত হয় বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির সত্যতা পায় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
তদন্তে উঠে আসা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—
* শিক্ষক-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়,
* প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের সময় অগ্রণী ব্যাংকের একটি সঞ্চয়ী হিসাব গোপন রাখা,
* প্রতিষ্ঠানের তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ,
* সরকারি সুবিধা হিসেবে পাওয়া এসি নিজ বাসায় ব্যবহার,
* প্রতিষ্ঠানের প্রকাশনায় অন্যের লেখা নিজের নামে প্রকাশ,
* দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয় এবং বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের একজন অধ্যাপককে নতুন অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পরে রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর পুনর্বহালের আদেশ সংগ্রহ করেন নূর সাখাওয়াত হোসেন মিয়া। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা বলেন,“যিনি তদন্তে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন এবং যাকে মন্ত্রণালয় নিজেই বহিষ্কার করেছে, তাকে আবার প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা কোনোভাবেই এমন ব্যক্তিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখতে চাই না।”
বর্তমানে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী তার পুনর্বহাল ঠেকাতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
সচেতন এলাকাবাসীর দাবি, ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী বরাবর পুনঃতদন্তের আবেদন করা হলেও এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তারা অবিলম্বে পুনঃতদন্তের মাধ্যমে পুনর্বহাল আদেশ বাতিল এবং অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে স্থায়ীভাবে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।