• বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০৬:৪৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
নরসিংদীর জিআই পণ্য লটকন: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও কম দামে দুশ্চিন্তায় চাষিরা রায়পুরায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে র‍্যালি ও সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত  জমি সংক্রান্ত বিরোধে সাংবাদিকের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর; আহত ২ রায়পুরায় গ্রাম আদালত বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কর্মশালা “ইত্যাদি” অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা: শতাধিক মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ চিকিৎসকদের নিরাপত্তায় নরসিংদীতে ড্যাবের মানববন্ধন গ্রামের সেই সাধারণ ছেলেটিই আজ অনেকের কাছে মানবিকতার প্রতিচ্ছবি। মন্ত্রিসভার আকার বাড়ার গুঞ্জন; জায়গা পেতে পারেন মঈন খান ও আশরাফ বকুল! কবি ও কথাসাহিত্যিক নূরচানের ৯টি বই বাজারে আইটির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা লুট করেছে আ’লীগ: ড. মঈন খান

নরসিংদীর জিআই পণ্য লটকন: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও কম দামে দুশ্চিন্তায় চাষিরা

Reporter Name
Update : বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

মো. শাহাদাৎ হোসেন রাজু

স্থানীয়ভাবে ‘বুগি’ নামে পরিচিত দেশীয় ফল লটকন ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও ঔষধিগুণসম্পন্ন ফল। একসময় এ ফলকে জংলি ফল হিসেবে গণ্য করা হতো। বন-বাদাড় ও ঝোপঝাড়ে জন্মানো গাছে স্বাভাবিকভাবেই ফল ধরত এবং তখন এর তেমন কোনো বাণিজ্যিক মূল্য ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে মানুষের মধ্যে লটকনের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায় ফলটির জনপ্রিয়তা ও চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

‘বুগি’ নামে পরিচিত এই ফলটি নরসিংদী জেলার ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। গাছের কাণ্ডজুড়ে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা লটকনের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সহজেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশেষ করে বর্ষাকালে প্রকৃতির স্নিগ্ধ পরিবেশে এর সৌন্দর্য আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। একসময় অবহেলিত এই ফল বর্তমানে একটি জনপ্রিয় অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে।

জানা যায়, প্রায় এক শতাব্দী আগে শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের আজকিতলা গ্রামের মরহুম হাজী হাকিম আব্দুল আজিজ এ অঞ্চলে লটকন চাষের সূচনা করেন। লটকন চাষে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিকবার চ্যানেল আই কৃষি পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ২০০৬ সালে লটকন চাষে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি জাতীয় কৃষি পুরস্কারেও ভূষিত হন। তার উৎসাহ ও উদ্যোগে শিবপুর ও বেলাব উপজেলার লাল মাটির বিস্তীর্ণ এলাকায় লটকন চাষ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়।

স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাজারে লটকনের চাহিদা বাড়ার কারণে প্রতিবছরই এর আবাদ সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে শিবপুর ও বেলাব উপজেলার হাজারো পরিবারের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে এই ফল। পাশাপাশি অনেক বেকার যুবকও লটকন চাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

তবে চলতি মৌসুমে শুরু থেকেই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন লটকন চাষিরা। মৌসুমের শুরুতে গাছে প্রচুর গুটি এলেও সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়া, দীর্ঘস্থায়ী খরা, পরবর্তীতে অতিবৃষ্টি এবং শিলাবৃষ্টির কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ গুটি ঝরে পড়ায় প্রত্যাশিত ফলন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা।

চাষিদের দাবি, এ বছর ফলন কম হওয়ার পাশাপাশি বাজারেও কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। মৌসুমের শুরুতে অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রতি কেজি লটকন ৩০ থেকে ৫০ টাকা কম দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার শিবপুর, বেলাব ও রায়পুরা উপজেলার লাল মাটিতে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদান থাকায় সেখানে লটকনের ভালো ফলন হয়। চলতি মৌসুমে জেলায় ১ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছে। হেক্টরপ্রতি গড়ে সাড়ে ১৭ টন হিসেবে প্রায় ৩০ হাজার ৭৭০ মেট্রিক টন (এক টন সমান ১,০১৬ কেজি) লটকন উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। উৎপাদিত লটকন পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ৮০ টাকা দরে বিক্রি হলে এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

শিবপুর উপজেলার কামারটেক এলাকার লটকন চাষি রুবেল মিয়া বলেন, “মৌসুমের শুরুতে গাছে প্রচুর গুটি ধরেছিল। এতে ভালো ফলনের আশা জেগেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন বৃষ্টির অভাবে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। পরে অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির কারণে অনেক গুটি ঝরে পড়ে। ফলে ফলন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।”
শিবপুর উপজেলার ছোটবন গ্রামের লটকন চাষি মামুন বলেন, “গাছে গুটি বেশি থাকায় ভালো ফলন ও ভালো দামের আশা করেছিলাম। কিন্তু আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব এবং বাজারমূল্য কমে যাওয়ায় সেই আশা অনেকটাই ভেঙে গেছে। লোকসান না হলেও প্রত্যাশিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।”

অপর লটকন চাষি মাসুদ মোল্লা জানান, তিনি নিজেই তার বাগানের লটকন বাজারে নিয়ে পাইকারি বিক্রি করেন। এতে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায়। চলতি বছর তিন বিঘা জমির লটকন বিক্রি করে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা আয় হবে বলে তিনি আশা করছেন। তিনি বলেন, লটকন চাষে তুলনামূলক কম পরিচর্যার প্রয়োজন হয়।
তিনি আরও বলেন, লটকনের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো ‘বল্লা’ পোকার আক্রমণ। এ পোকা ফলের গুটিতে ছিদ্র করে, ফলে আক্রান্ত গুটি ঝরে পড়ে। সাধারণত কীটনাশকযুক্ত ফাঁদ ব্যবহার করে এ পোকার আক্রমণ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

লটকনের পাইকারি ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম জানান, তিনি প্রতিবছর মৌসুম শুরুর আগেই বাগান কিনে থাকেন। এ বছর তিনি ১৫টি লটকনের বাগান কিনেছেন, যার জন্য প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এসব বাগান থেকে উৎপাদিত লটকন বিক্রি করে অন্তত ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা লাভ হবে বলে তিনি আশা করছেন।
চাষিরা বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, মৌসুমের বাকি সময়ে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হলে ক্ষতির একটি অংশ হলেও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, “মৌসুমের শুরুতে অনাবৃষ্টির কারণে লটকন চাষিরা কিছুটা খরার প্রভাবের মুখে পড়লেও সামগ্রিকভাবে গত বছরের তুলনায় এ বছর ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। লটকন চাষকে আরও আধুনিক, টেকসই ও লাভজনক করতে এবং রোগবালাই সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করতে কৃষি বিভাগ মাঠপর্যায়ে কাজ করছে।”

তিনি আরও বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত আবহাওয়া কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। লটকনসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফলের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব দৃশ্যমান। তাই কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে তারা পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে উৎপাদন ধরে রাখতে পারেন।”

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category