নরসিংদী প্রতিনিধি

নরসিংদীতে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ঘরে ঘরে ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান মিলছে। দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে রোগীর উপচেপড়া ভিড় দেখা দিয়েছে। ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।

নরসিংদী ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালসহ বিভিন্ন ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে কোনো শয্যা খালি নেই। শয্যার সংকট থাকায় ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা ও করিডোরে মশারি টাঙিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, প্রতিদিন যে হারে নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, তা সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত শয্যা ও জনবল হাসপাতালে নেই।

নরসিংদী সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৮৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ১৮ জন, ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ৩০ জন, মনোহরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১ জন, পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯ জন, শিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭ জন এবং রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন।

জানা গেছে,  বৃহস্পতিবার জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হিসেবে নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ২৫ জন। একই দিনে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৫ জন। এদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন মোট ৮৮ জন। এর আগের দিন বুধবার নতুন করে শনাক্ত হন ৪৩ জন, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন ৪১ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ১০৪ জন।

মঙ্গলবার ডেঙ্গু শনাক্ত হয় ২১ জনের। এদিন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৪ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ১০২ জন। গত ৭ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল ৩৭ জনের। ওই দিন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন ৪১ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ১০৫ জন। এছাড়া ৬ সেপ্টেম্বর নতুন করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয় ৩৫ জনের। সেদিন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন ৯ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১০৯ জন।

একদিকে রোগীর উপচেপড়া ভিড়, অন্যদিকে চিকিৎসক ও নার্সের তীব্র সংকট—সব মিলিয়ে হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা দিতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ল্যাবরেটরিতে রক্তের প্লাটিলেট ও সিবিসি পরীক্ষা করাতে দীর্ঘ লাইন পড়ছে। ল্যাব কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ থাকায় পরীক্ষার রিপোর্ট পেতেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি সময় লাগছে।

পলাশ উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের আলাউদ্দিন নামে এক ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী জানান, তিনি তিন দিন ধরে জেলা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। শরীরে জ্বরসহ ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে তিনি হাসপাতালে আসেন। পরে চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর হাসপাতালে ভর্তি রাখেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা ও ওষুধ হাসপাতাল থেকেই বিনামূল্যে পাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

নরসিংদী ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের ল্যাব টেকনিশিয়ান শাহ আলম মিয়া বলেন, ‘আগে যেখানে দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ জন রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হতো, বর্তমানে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ১৬০ জন রোগীর পরীক্ষা করা হচ্ছে। এদের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ রোগীর নমুনায় ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে।’

নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. ফরিদা গুলশানারা কবির বলেন, ‘শয্যা সংকটের কারণে আমরা চাইলেও যেসব ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা প্রয়োজন, তাদের সবাইকে ভর্তি করতে পারছি না। এ ক্ষেত্রে যাদের বাসায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব, তাদের স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং আমাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি রোগীর পরিবারের সদস্যদের বলা হচ্ছে, রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন হলে তা যেন নিয়মিত আমাদের জানানো হয়।’

নরসিংদী ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এএনএম মিজানুর রহমান জানান, যে হারে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। হাসপাতালে আসা রোগীদের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। এখনো নরসিংদী হটস্পট হয়ে ওঠেনি, তবে ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

নরসিংদীর সিভিল সার্জন ডা. মো. বুলবুল কবীর জানান, জেলায় ডেঙ্গুর কিট পর্যাপ্ত রয়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত। গত সপ্তাহের তুলনায় চলতি সপ্তাহে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কম। তবে পরিস্থিতি আবারও বাড়তে পারে। এজন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নেই।