নরসিংদী প্রতিনিধি

নরসিংদীতে এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের অভিযোগ তুলে তাদের মানহানির পাশাপাশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর ধরে চলা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধিসহ অন্তত এক ডজন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শারমিন রেজোয়ানা ইভা (৩৭) নরসিংদীর মাধবদীর আলগী গ্রামের মৃত মো. আব্দুস সাদেকের মেয়ে। বর্তমানে তিনি নরসিংদী পৌরসভার ২০২ পূর্ব ব্রাহ্মন্দী মহল্লার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। তিনি আলগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত। সম্প্রতি জেলার এক সাংবাদিক ও এক জনপ্রতিনিধিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার দেওয়া বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

একাধিক স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, তিনি নিয়মিত ফেসবুক লাইভ ও ব্যক্তিগত আইডিতে বিভিন্ন ব্যক্তির ছবি প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, যৌন হয়রানিসহ নানা অভিযোগ উত্থাপন করেন এবং আপত্তিকর ভাষায় মন্তব্য করেন। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে অর্থ দাবি করা হয়। দাবি পূরণ না হলে আরও অপপ্রচার কিংবা মামলা করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। তবে তার সেই কাঙ্খিত টাকা পেলে ফেসবুকের লাইভে এসে ওই সব ব্যক্তিদের কাছে ক্ষমা চাওয়ারও ভিডিও প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের দাবি, প্রথমে পরিচয় ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি করা হয়। পরে ভিডিও কল বা অন্যান্য মাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি ও স্ক্রিনশট সংগ্রহ করে সেগুলো ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগ করা হয়। সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক সম্মানের কথা বিবেচনা করে অনেকেই বিষয়টি প্রকাশ্যে না এনে আপসের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলেও তারা দাবি করেন।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, শারমিন রেজোয়ানা ইভা বিভিন্ন সময়ে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। একই সঙ্গে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট প্রকাশের অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে সমঝোতার পর ওইসব পোস্ট সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে গত বছরের ৯ এপ্রিল তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০১৯-এর একাধিক ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাড়ির মালিক থেকে শুরু করে চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, ঠিকাদার, রাজনীতিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের বিরুদ্ধে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছেন। এতে অনেকেই সামাজিক ও পারিবারিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় নরসিংদীর সচেতন নাগরিকরা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যদিকে অভিযোগগুলো যদি অসত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে মিথ্যা মামলা, মানহানি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগেও যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শারমিন রেজোয়ানা ইভার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিরঞ্জন কুমার রায় বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ পোস্টের জন্য গত বছরের এপ্রিল মাসে শারমিন রেজোয়ানা ইভাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়ে ছিল। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তার বেতন কর্তন করেছিলাম এবং সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সুপারিশক্রমে তাকে নারায়ণগঞ্জের সীমান্ত এলাকার (এ মূহুর্তে মনে নেই) কোন একটি স্কুলে বদলী করা হয়েছিল।
গত বছরের ন্যায় তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবারও বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছেন। তাহলে পূনরায় তার বিরুদ্ধে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহন করবেন কি? এমন প্রশ্নের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, এব্যাপারে উপজেলা পর্যায়ে আমাদের একটা কমিটি রয়েছে। কমিটির কাছ থেকে আমরা সাধারণত সুপারিশ পাওয়ার পর ব্যবস্থা গ্রহন করে থাকি।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের দাবি, আলোচিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে পুলিশ, শিক্ষা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্টদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।